মায়ের গর্ভে থাকতে বাবা মারা যান, ফলে জন্মের পর সবার কাছে স্বীকৃতি মেলে ‘অপয়া’ নামে। শ্বশুরবাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেয়া হয় শোভার মাকে। নানা ঘাত-প্রতিঘাত, সংগ্রাম করে ব্রাক্ষণবাড়িয়ার শোভা চান্স পেয়েছেন বুয়েটে। সংগ্রামী শোভার সফলতার গল্প ছড়িয়ে পড়েছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। বুয়েট, ঢাকা, জাহাঙ্গীরনগর, রাজশাহী, বুটেক্সসহ বেশ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা দেন শোভা এবং সবগুলোতে মেধাতালিকায় প্রথম দিকে অবস্থান থাকে। অবশেষে গত ২৫ নভেম্বর বুয়েটের চূড়ান্ত ফলাফলে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ভর্তির সুযোগ পেয়েছেন শোভা।

 

শোভার জন্মের আগে তার বাবা মারা যান। জন্মের পর তাকে ‘অপয়া’ বলে শ্বশুর বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেয়া হয় তার মাকে। মা প্রতিমা রাণীর আশ্রয় হয় শোভার মামার বাড়িতে। দাদু দ্বিতীয় বিয়ে করায় মামার বাড়িতেও অপরিচিতের মত থাকতে হয় তাদের।

স্থানীয় একটি স্কুলে দপ্তরির কাজ করতেন শোভার মা। ততদিনে বড় হয়েছেন শোভা, অ আ ক খ শিখে ফেলেছেন। একদিনের ঘটনা, জামা কেনার জন্য বায়না ধরেছিলেন মায়ের কাছে। মা প্রতিমা রাণীর হাতে টাকা না থাকায় ঘরের ডিম বিক্রি করে জামা কিনে দেন তাকে। মামা জানতে পেরে রাগ করে মাকে তাড়িয়ে দেন ঘর থেকে। একটি পোঁটলা আর সঙ্গে শোভাকে নিয়ে প্রতিমা রাণীর যেন অতল সাগরে পড়লেন।

উপায়ান্তর না দেখে প্রতিমা রাণী তখন তাঁর পিসির বাড়িতে গেলেন। কিন্তু তাঁদের সংসারেও নুন আনতে পান্তা ফুরায়। দুই তিন মাস পর প্রতিমা রানীর একটা কাজ জুটল কুমিল্লার কোম্পানীগঞ্জে। এক ব্যবসায়ীর বাড়িতে, গৃহপরিচারিকার কাজ। সেই বাড়িতে রান্নাঘরের পাশে ছোট্ট একটা রুমে থাকতেন মা-মেয়ে। পাশ্ববর্তী বেগমগঞ্জ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি হন শোভা। তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ার সময় একদিন বাড়িওয়ালা বললেন, ‘কাজ করে একজন। খায় দুজন। তোমার মেয়েকে কেন রাখব?’ ফলে সেই বাসাও ছাড়তে হলো।

গন্তব্য আবার মামার বাড়ি, যাওয়ার যে কোনো জায়গা নেই। অনেক অনুনয়-বিনয়ের পর মামার মনে দয়া হল। শোভাদের ঠাঁই হলো মামার বাড়িতে। শোভা ভর্তি হলেন ক্লাস ফোরে। কিন্তু ভাগ্যের পরিহাস কোনো কাজ জোগাড় করতে না পারায় ফের ছাড়তে হলো মামার বাড়ি। এবারও শেষ ঠিকানা মায়ের সেই পিসি। প্রতিমা রাণী মেয়েকে সেই বাড়িতে রেখে কুমিল্লা চলে গেলেন। এক বাসায় গৃহপরিচারিকার কাজ পেলেন। কিন্তু দুঃখ যেন শোভার মায়ের পিছু ছাড়ে না, যে বাসায় কাজ করতেন বছরখানেক পর তারাও অন্যত্র চলে যায়। ফলে তিনি আবার গ্রামে ফেরেন।

মামার বাড়িতে ঠাঁই নেই, পিসির বাড়িতেও জায়গা নেই। মেয়ের নিরাপত্তার কথা ভেবে একরকম নিরূপায় হয়ে বিয়ের পিড়িতে বসেন প্রতিমা রাণী। বিয়ের পর ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় নতুন ঠিকানা হয় মা-মেয়ের। সেখানে আদর্শ কিন্ডারগার্টেন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে চতুর্থ শ্রেণিতে ভর্তি হন শোভা। পিএসসি পাসের পর ব্রাহ্মণবাড়িয়া গভর্নমেন্ট মডেল গার্লস হাই স্কুলে ভর্তি পরীক্ষা দিয়ে পড়ার সুযোগ পান। স্কুলের পাশ্ববর্তী এক কোচিং সেন্টারের দিদার এবং পার্থ নামে দুই শিক্ষকের সহায়তায় নানা প্রতিবন্ধকতায় পড়াশোনা চালিয়ে যান।

নতুন বাবা চায়ের দোকানে কাজ করতেন। একদিন কাজ করলে দুই দিন বসে থাকতেন। ঠিকমতো চাল-ডাল আনতেন না। ঘরভাড়াও বাকি পড়ত। এ নিয়ে প্রায় প্রতিদিনই ঝগড়াঝাঁটি হতো। একটু উচ্চবাচ্য করলেই মায়ের ওপর চলত নির্যাতন। পড়ার টেবিলে বসে কত যে চোখের জলে বইয়ের পাতা ভিজিয়েছেন শোভা, তাঁর হিসেব নেই।

সপ্তম শ্রেণিতে পড়াকালে শোভা টিউশনি শুরু করেন। তবে খাবার, পোশাক-আশাক থেকে শুরু করে সব কিছু মা প্রতিমা রানীকেই জোগাড় করতে হতো। স্থানীয় একটা কারখানায় আচার, চকোলেট ইত্যাদির প্যাকেট বানাতেন মা। আচারের এক হাজার প্যাকেট বানালে ৩০ টাকা পেতেন।

জেএসসি পরীক্ষার রাতগুলোও খুব কষ্টে কাটে শোভার। নতুন বাবা প্রায়ই রাতে এসে ঝগড়া করতেন। কাঁদতে কাঁদতে ঘুমিয়ে পড়তেন শোভা, পরে সকালে উঠে কোনোমতে পরীক্ষা দিতে যেতেন। এত বাধা-বিপত্তি সহ্য করেও জেএসসিতে গোল্ডেন এপ্লাস পান। বৃত্তিও পেলেন শোভা। ক্লাস নাইনে উঠার পর খরচ মেটাতে না পেরে পড়াশোনা ছেড়ে দিতে চেয়েছিলেন শোভা। কিন্তু স্কুলের শিক্ষক, কোচিংয়ের স্যাররা অনুপ্রেরণা যুগিয়েছে।

নানান বিরূপ পরিবেশের সাথে লড়াই করে টিকে থাকতে হয়েছে শোভাকে। এসএসসিতে পদার্থবিজ্ঞান পরীক্ষার আগের রাতে মায়ের সঙ্গে ঝগড়া করে বাবা ঘর থেকে বের করে দেন। রাতভর কিছুই পড়তে পারেননি। কিন্তু পরীক্ষা শেষে দেখা গেল গড়ে পদার্থ বিজ্ঞান, রসায়ন, গণিত ও উচ্চতর গণিতে ৯৮.৯১ নম্বর পেয়ে গোল্ডেন এপ্লাস পেয়েছেন।

টিকতে না পেরে এক পর্যায়ে অতিষ্ঠ হয়ে শোভা শহরে একটা মেসে উঠেন। একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণিতে কেন্দ্রবিন্দু আরেক কোচিং সেন্টারে বিনা পয়সায় কোচিংয়ের সুযোগ পান। তারা বৃত্তি দিত। এদিকে অপুষ্টি, ক্রমাগত শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের ফলে মা প্রতিমা রাণী তত দিনে অসুস্থ হয়ে পড়েন। কিডনি, মেরুদণ্ডের সমস্যাসহ নানা রকম জটিলতায় ভুগছিলেন। নিজের খরচ চালানোর পাশাপাশি মাসে আড়াই হাজার টাকার মতো মায়ের চিকিৎসার পেছনে খরচ হতো। এই সকল প্রতিবন্ধকতার মধ্যে শোভার এইচএসসি পরীক্ষা শুরু হয়।

আবার ভাগ্য সুপ্রসন্ন হলো। এইচএসসি পরীক্ষার আগে দরিদ্র ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের সহায়তার জন্য ঘুড্ডি ফাউন্ডেশন একটা পরীক্ষার আয়োজন করেছিল। সেখানে নির্বাচিত হয়ে বিনা মূল্যে বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি কোচিং ও হোস্টেলে থাকার সুযোগ পান শোভা। এর মধ্যে ঈদ আসে, পূজা আসে। সবাই নিজ নিজ বাড়ি যায়। কিন্তু শোভার যাওয়ার কোনো জায়গা নেই। দৃঢ়মনে সংকল্প নেন শোভা বিশ্ববিদ্যালয়ে তাকে পড়তেই হবে।

বুয়েট, ঢাকা, জাহাঙ্গীরনগর, রাজশাহী, বুটেক্সসহ বেশ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা দেন শোভা এবং সবগুলোতে মেধাতালিকায় প্রথম দিকে অবস্থান থাকে। অবশেষে গত ২৫ নভেম্বর বুয়েটের চূড়ান্ত ফলাফলে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ভর্তির সুযোগ পেয়েছেন শোভা।

ডেল্টামেইল/৩নভেম্বর/জেআ

আপনার মন্তব্য দিন

আপনার মন্তব্য লিখুন!
এখানে আপনার নাম লিখুন