দেশের বাড়ি

দেশের বাড়ি

দেওয়ালের গা পিছলে হালকা লালচে আলো ছড়িয়ে রয়েছে চারদিকে। আর রয়েছে বড় বড় কয়েকটা অয়েলপেন্টিং। বিরিয়ানির গন্ধে ম ম করছে চারদিক। ইকবালভাই বলল, এখানের ফিরনিও খুব বিখ্যাত। আমি হাঁ করে চারদিক দেখছিলাম। ইকবাল ভাইয়ের কাছে আমার কৃতজ্ঞতার শেষ নেই। তবু আমার দমবন্ধ হয়ে আসছিল যেন… 

ব্রেন কারি খাইয়া দ্যাখেন…সেও বড় বিখ্যাত। ইকবালভাইয়ের বন্ধু আসিফ রেজা আমাকে বলল। আর আমি বলতে   যাচ্ছিলাম, জানেন তো, এখানে না জীবনানন্দও আসতেন মাঝে মাঝে। 

গরুর ব্রেন কারি, খাইবেন তো আপনি? আসিফ আমার দিকে তাকিয়ে বলে।

আমি বলি, না না, গরু আমি খাইনা।

হ, আপনাগো তো শাস্ত্রে নিষেধ। আসিফ মেনু কার্ডে ঝুঁকে পড়ে অন্য খাবার খোঁজে। 

আমি বিব্রত মুখে হাত-পা নেড়ে বলি, আরে না, বিষয়টা তা নয়। আসলে আমার মামাবাড়িতে অনেক গোরু পোষা হত। ছোট বয়সে তাদের সঙ্গে খেলে বড় হয়েছি। তাই খাইনা আর কি। বছর খানেক আগে অব্দি কোন মাংসই খেতাম না। চারধারে হাঁস মুরগি, ছাগলছানা… সবই বড় প্রিয় ছিল।    

আচ্ছা… আপনি বড় সেনসিটিভ মানুষ দেখতে আসি।– ইকবাল ভাই হাসে।

 *           *             *          *          *           

মিস্টু মনা, তোমার মাথায় আবার সেই স্ক্রু ঢিলে হয়েছে?

আমি রেগে পা ঠুকি… তুমিও এমন কথা বলবে? কবে থেকে পাসপোর্ট বানিয়ে বসে আছি, শুধু ওখানেই যাব বলে?

হুম… আগে গেলেনা কেন বাবু? এমন একা একা এখন… আমিও কদিন বাদে বাইরে বেরিয়ে যাচ্ছি … 

বাবা যেতে দেয়নি গো, সেই যে রায়টের সময় পালিয়ে এসেছিল, এইটুকু বাচ্চা তখন; সেই আতঙ্ক আর কাটেনি। বাবা এমন আচমকা চলে গেল…! তারপর থেকে ওই দেশ আমাকে বড় টানছে। সেই সব পুকুর-খাল-নদী, বাড়ি-বাগান…    আমি না সব চোখের সামনে দেখতে পাই। দাদুর কাছে, বাবার কাছে এত গল্প শুনেছি…

আমি দুদিন ছুটি নিয়ে তোমার সঙ্গে চলে যাব? ওখানে তোমাদের বাড়িটারও তো কোন নির্দিষ্ট হদিশ পেলে  না! 

এ মা… কদিন বাদেই না তোমার ডেনমার্ক যাওয়া? না হলে লুকিয়ে লুকিয়ে তুমি সঙ্গে গেলে তো আমার দারুণ  লাগতো।

পরে গেলে হয় না? আমি ঘুরে আসার পর?

নাহ;…আমাকে এখনই যেতে হবে। বরিশাল আমাকে ভীষণ টানছে…। বাধা দিও না। তুমি যাবার আগে তো আমাকে ফিরতে হবে? আর দেশের বাড়ির খোঁজ অলরেডি লাগিয়ে দিয়েছি, ওখানের এক বড় জার্নালিস্টকে বলেছি। বাবা তখন এত ছোট ছিল…পিসিরা একটু বড়, তাও ঠিকমত অ্যাড্রেস বলতে পারছে না। ও ঠিক খুঁজে বার করা যাবে।

– বাহ, এটা ভাল খবর।

-দেখলে কেমন আচমকা বৃষ্টি নামলো? চল দৌড়ে ওপারে যাই, টি জংশনটা ওখানেই তো?       

– তোমরাও কি জমিদার ছিলে সেখানে? বৈভব পকেট থেকে বড় রুমাল বার করে আমার মাথা মুছতে মুছতে জিজ্ঞেস করে। দীঘি, কাঠের বাড়ি… কত কি ছিল না তোমাদের? 

তোমাকে গল্প করেছি তো; হ্যাঁ গো, দীঘি, কাঠের বাড়ি সব ছিল। আমরা জমিদার ছিলাম না, কিন্তু বেশ ধনী   ছিলাম। বাবার দাদু খুব বড় ব্যাবসায়ি ছিলেন। প্রচুর সম্পত্তি করেছিলেন।  রাজা জমিদারদেরও তিনি টাকা ধার   দিতেন। 

তাই? বাপরে, কিসের ব্যবসা ছিল?

না, সে শুনলে তুমি খারাপ ভাববে।

মানে! কাকে? তোমার বাবার সেই দাদুকে? উফহ পাগল আর কাকে বলে! বেশ বলতে হবে না…

না বলব! লজ্জা পাচ্ছি একটু, আমাকে খারাপ ভেবনা যেন!  ওনার ছিল মহাজনী ব্যাবসা। সুদে টাকা খাটানো; এক রাজা তো প্রচুর টাকা নিয়ে শোধই দিল না। সেই শোকেই নাকি বাবার দাদু মারা গেছিলেন। ছোট বয়সে একদিন আমার দাদুকে বলতে শুনেছিলাম, সুদের ব্যবসার পাপ তাঁকে ধারণ করতে হয়েছে; তাই বোধহয় বাড়ি-জমিজমা-কলেজের চাকরি সব ছেড়ে এক কাপড়ে তাঁকে দেশ ছাড়তে হল!  

তুমি কোন চা খাবে? ওই স্পেশাল চা-টা বলি? মিস্টু রানি, এসব কথা শুনলে আমারও কেমন কষ্ট হয়! আজ তোমার দেশের বাড়ির গল্প শুনব। বলবে আমাকে?  

ধেৎ তুমি আমার মন রাখার জন্য বলছ, মোটেই এমন ইচ্ছে হচ্ছে না! তোমার অরিজিন তো এখানেই। দেশ ছেড়ে আসার বেদনা তুমি বুঝবে না! আশ্চর্য ভাবে সে জিন আমিও বহন করে চলেছি! আমার বাবা, দাদু…কেউ আর দেশে ফিরে যেতে পারেনি। একবার যদি বাড়িটার কাছে গিয়ে একটু দাঁড়াতে পারতাম…তাদের আগ্রাসী আকাঙ্খা, আমার দৃষ্টি দিয়েই মিটিয়ে নিতাম!  

বল মিস্টু, সে সব নদী, কাঠের বাড়ি, খাল-বিল-বাগানের গল্প?    

বড় বড় কাপে করে ধোঁয়া ওঠা চা আসে, সঙ্গে গরম ফ্রেঞ্চ ফ্রাই।

– বাবার কাছে, দাদুর কাছে শোনা কত গল্প। বাড়ির চারতলার ওপর ছিল একটা বিরাট হলঘর। দেওয়ালে তার কাঠের কারুকাজ। মাথার ওপর টিনের চাল। বৃষ্টির ফোঁটা সেখানে অদ্ভুত সুর তুলত। বাবার ছোট থেকে মা ছিলনা। তাই ঠাকুমা তাকে খুব ভালবাসতেন। বৃষ্টির দিনে সব নাতিনাতনিকে নিয়ে ঠাকুমা গল্পের প্যাঁটরা খুলে বসতেন। আমার    অল্পবয়সি  দাদুভাই, কলেজে পড়িয়ে, নিজেদের বইয়ের দোকান ঘুরে তখন হয়তো সাইকেলে চেপে বাড়ি ফিরছেন। তিনি চাকরি পেয়েছেন বরিশালের বিখ্যাত ব্রজমোহন কলেজে। তাঁর বাড়ি ফেরার বাঁধানো সেই রাস্তার দুদিকে ছিল খাল আর  অজস্র সবুজ গাছ। খালগুলো কিন্তু নদী ছিল আগে। দিনে দিনে তা খালের আকার নিয়েছে। আসলে বরিশাল হল চারদিকে জলে ঘেরা এক দ্বীপ। মানুষকে সেখানে প্রতিনিয়ত যুদ্ধ করে বাঁচতে হত। এই যে সবাই বলে না, বরিশালের  মানুষ দুর্ধর্ষ; তাদের রোজকার জীবন যাত্রাই হয়তো তাদের এমন করে গড়ে তুলেছিল।  

কী সুন্দর মিস্টু… আমার যেতে ইচ্ছে করছে। 

আমাদের নিজেদেরই একটা দীঘি ছিল। সেখানে বিরাট বিরাট মাছ জলের মধ্যে ঘাই মারত। ছোটরা সেই দীঘিতে  সাঁতার দিত, নৌকা বাইত। বাবার অন্নপ্রাশনে তিরিশ আর চল্লিশ কেজির দুটো মাছ তোলা হয়েছিল সেখান থেকে।  আমার দাদুভাই তার নতুন বউকে নিয়ে সেখানে দাঁড়িয়ে লুকিয়ে লুকিয়ে গল্প করত। আমারও খুব ইচ্ছে, তোমার হাত ধরে ওই দীঘির পাশে দাঁড়াই, 

 হ্যাঁ তো, আমি পরের বারই তোমার সঙ্গে ঘুরতে যাব… তোমার দেশের বাড়ি। আচ্ছা সেই অদ্ভুত নামের নদীটা…তার কথা বললে না?

কীর্তনখোলা। আমাদের বাড়ি থেকে খুব বেশি দূরে ছিলনা তা। বর্ষাকালে এত এত ইলিশ মাছ উঠত সেখানে… আস্ত আস্ত মাছ ভাজা খেত সবাই।  বছরে একবার করে সেখানে বাইচ প্রতিযোগিতা হত। আমার দাদুভাই বহুবার সে খেলায় জিতেছে। আমি তখন খুব ছোট্ট, দাদুভাই বুঁদ হয়ে গল্প বলে যেত আমায়…সব বুঝতামও না। শুধু তার জ্বলজ্বলে চোখ দুটোর দিকে তাকিয়ে থেকে আমার খুব আনন্দ হত। দাদুভাইকে প্রায়সময়ই আমার ভীষ্মর মত মনে হত।  কিন্তু ওই সময়গুলোতে তাকে আমার অর্জুনের মত উজ্জ্বল লাগত। 

মিস্টু…আমাকে তোমার কার মত লাগে?

দেখ কান্ড, কোথ্ থেকে কি! আচ্ছা বেশ… কৃষ্ণের মত! দুরন্ত দুষ্টু !    জানো আমাদের সেই বাড়িতে ঢোকার মুখেই ছিল কৃষ্ণ মন্দির। দুদিকে বড় বড় পুকুর আর তার মাঝখান দিয়ে রাস্তা চলে গেছে সদর দরজা অব্দি। বাড়ির মধ্যেই পাঠশালা, দূর দূর থেকে ছেলেরা পড়তে আসতো। সেই দুর্দান্ত প্রতাপ  মানুষটি বোধহয়…  সুদ নেবার পাপ ঘোচানোর জন্যই, মন্দির আর সবার জন্য পাঠশালা খুলে দিয়েছিলেন। জানিনা…এখন গিয়ে কতটা কি দেখব! ভিন্ন ধর্মের মানুষের বসবাস এখন। দাদু নাস্তিক ছিলেন; তবু মাঝে মাঝে তিনি মন্দিরটার কথা বলতেন… আশ্চর্য , না!    

অনেক কিছুই জানা বোঝার বাইরে থাকে মিস্টু! এই যে তুমি এখনকার জেনারেশন; তোমার বেড়ে ওঠা, এমনকি  তোমার বাবা-মা’র বেড়ে ওঠাও কলকাতায়… তবু তুমি পূর্বপুরুষের ছেড়ে আসা দেশ এবং দেশের বাড়ি নিয়ে কত   অবসেসড্!

আমি চা’য়ে চুমুক দিই। বৈভবের বড় বড় আঙুলগুলো হাতের মুঠোয় নিয়ে ভাবি, অবসেসড্! কে জানে…

 *           *             *          *          *        

বুড়িগঙ্গা পেরিয়ে মেঘনার ওপর দিয়ে জাহাজ এগিয়ে চলেছে বরিশালের দিকে। ঢাকা থেকে জাহাজে ওঠার আগেই ইকবালভাই সুখবরটা দিয়েছিল। ব্রজমোহন কলেজে খবর লাগিয়ে তিনি অবশেষে আমাদের বাড়ির সন্ধান পেয়েছেন। বইয়ের দোকানটিরও আবছা আভাস পেয়েছেন। জাহাজের ডেকের ওপর প্রচণ্ড হাওয়া। সেই হাওয়ায় আমি যেন উড়ে চলেছি। যে উঠোনে বাবা গোল্লাছুট খেলত, যে দীঘিতে গামছা পেতে মাছ ধরত, কাল সকালেই আমি সে বাড়ির সামনে গিয়ে দাঁড়াবো!  মাঝরাত অব্দি নদীর অপূর্ব শোভা দেখে শুতে যাই নিজের সিঙ্গিল কেবিনটিতে। উত্তেজনায় ভাল ঘুম হয়না। রাশি রাশি জল পেরিয়ে আমাদের চারতলা ঝলমলে জাহাজ এগিয়ে চলে গন্তব্যে… কীর্তনখোলা নদীর পাশে সাম্রাজ্য বিছিয়ে থাকা বরিশালে।

জাহাজের আগাপাস্তালা ঘোরাঘুরি করে প্রচুর নতুন বন্ধু করে ফেলেছি। তারা ‘ইন্ডিয়া থিকা আসা একা মাইয়ার’  আপ্যায়নে ব্যাস্ত হয়ে পড়ে। জাহাজের ক্যাপ্টেন অর্থাৎ সারেঙ পর্যন্ত তাঁর কেবিনে বসিয়ে আমাকে নদী চেনায়। বরিশাল তো তাঁরও দেশ। সেই দেশ ‘দ্যাখতে আসা’ একা মেয়েটির তিনিও খেয়াল রাখেন। -বুইন, রাতে দাওয়াত আসে,      আমার সঙ্গে খাবা। আর ভোর রাতে আমি তোমারে ডাইক্যা দিমু, তখনই চন্দ্রদ্বীপ আইবে।  

আমার গলা ব্যাথা করে…। এত ভালবাসা- বাবা, দাদু …কেউ দেখল না! 

সামান্য একটু ঘুম; ভোররাতে নিজেই ধড়মড় করে জেগে উঠি। স্বপ্ন দেখছিলাম, দেশের বাড়ির দাওয়ায় বসে মুড়ি নারকোল খাচ্ছি আর দাদু পাশে বসে আমায় গাছ চেনাচ্ছে। রাত শেষ হয়ে আসছে। হুড়োহুড়ি করে চারতলার ডেকে  গিয়ে দাঁড়াই। পাশেই সারেং দাদার কেবিন। একটু বাদেই তিনি ডাক দেন… ওই দেখ বুইন, কীর্তনখোলার ওপর চন্দ্রদ্বীপ, জিগাইছিলা না?

আধো অন্ধকারের মধ্যে দূরে জেগে উঠছে দ্বীপ, যেখানের রাজা আমাদের বাড়ির এক পুরুষকে প্রতারণা করে নিঃস্ব করে দিয়েছিলেন। ইতিহাস জানেনা… কেউ জানেনা সে কথা;  শুধু ফিসফিস করা এক অনুরণন থেকে যায় সেই     পুরুষটির উত্তরসূরিদের মধ্যে।

ভোর হয়ে আসে… চারদিকে জল আর সবুজের গন্ধ। কোত্থেকে এক বুলবুলি পাখি, বুকের ভেতর মোচড় দিয়ে কেবলই  আমার কানের কাছে ডেকে যায়। জাহাজ এসে লাগে ঘাটে। ইকবালভাই এসেছেন ইনিই আমাকে দেশের বাড়ি দেখাবেন…  

 *           *             *          *          *     

-আগে ব্রজমোহন কলেজ যাই, আপনার দাদা পড়াইথেন তো? প্রিন্সিপাল সাহেবরে বইল্যা রাখসি। আপনাগো বাসায়   যাবার পথটা হেই দিকেই।

আমি ঘাড় নাড়ি, আচ্ছা। কিন্তু বাড়িটা ভাল করে দেখতে পাব তো? সন্ধ্যার জাহাজেই তো ফিরে যাব!

আরে অবশ্যই! ওই দ্যাখেন জীবনানন্দের বাসা… আপনার দাদার বন্ধু আসিল তো? এখানের বাতাসটা দ্যাখসেন, কী মিষ্টি!

না, আমার দাদুভাইয়ের থেকে অনেক বড় ছিলেন তিনি। তবে বইয়ের দোকানে আসতেন। অনেক বড় বড় মানুষ আসতেন সেখানে। আচ্ছা খাল কোথায়? বাবা আর দাদুর কাছে পথের দুধারের সেই খালের কথা অনেক শুনেছি। সেখানে নাকি জোয়ার ভাটাও খেলত। 

দ্যাখেন দুধারে…খাল সরু হইয়া আইসে; আগের মত নাই।

রাস্তার দুপাশে পরিষ্কার টলটলে জলের নর্দমা। গাড়ি এগিয়ে চলে কলেজের দিকে। সেখানে  প্রিন্সিপাল স্যার ‘দুগ্গা মাছভাত খাইয়া’ যাবার জন্য জোরাজুরি করেন। এই আমাদের দেশ ছিল? কী অপূর্ব!    

 *           *             *          *          *     

এবার গাড়ি এগিয়ে চলে বাড়ির দিকে, গাছে ঠাসা ঝকঝকে রাস্তা। যেন কোন পর্যটন শহর। আর এই  দিনদুপুরেও তীব্র ঝিঁঝিঁর ডাক।  আমার বুকের ভেতর প্রবল ওঠাপড়া; সত্যিই আমি দেশের বাড়ি এলাম!

গাড়ি দাঁড়ালো। দুদিকে টলটলে পুকুর, বড় বড় নারকেল-সুপুরি-হিজল আর রেন ট্রি। আমি এগিয়ে চলি স্বপ্নের সেই  রাস্তা ধরে। এইতো আমার বাড়ি ঢোকার রাস্তা! এসব কিছুই আমার শোনা, জানা! কিন্তু একী! পথের শেষে উঠোনের পাশে নিতান্ত মধ্যবিত্তের সাদামাটা দোতলা বাড়ি! আমি ছিটকে পিছিয়ে আসি…না না, এ আমাদের বাড়ি নয়! চারতলার   সেই ঘর, কাঠের দেওয়াল…সে সব কই!

ইকবালভাই হেসে ফেলে।- আপনার কওয়া তথ্য অনুযায়ী এটাই আপনাগো বাসা আছিল। ওই দ্যাখেন মন্দির…

তাকিয়ে দেখি, রাস্তার একধারে বিমর্ষ হয়ে হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা জীর্ণ মন্দির। ততক্ষণে বাড়ির বাসিন্দারা আড়াল থেকে উঁকিঝুঁকি মারে। মেয়েদের মাথা ঢাকা। পুরুষরা লুঙ্গিপরা, রুষ্ট মুখ। তারা সপাট এক চড়ের মত দড়াম করে মুখের  ওপর দরজা বন্ধ করে দেয়।

ইকবাল ভাই দৌড়ে আসে আমার দিকে; প্লিজ আপসেট হইবেন না, ব্যাপারখান আমি দেখতে আসি…

আশেপাশের লোকজন এগিয়ে আসে। আমি মৌন, নিথর। উঠোনের মাঝে একা দাঁড়িয়ে থাকি; তাদের কথা টুপটাপ ঝরে পড়ে আমার গায়ে-মাথায়।   

-হ, এডাই তো ছিল চক্রবর্তী গো বাসা, পাঠশালা আছিল এইখানে; অনেকদিন আগে তারা সবসুদ্ধা ইন্ডিয়া চইল্যা  গ্যাসে।   

আমার ঝাপসা দৃষ্টির সামনে দরজা খুলে কারা যেন এগিয়ে আসে। ইকবালভাই কানের কাছে এসে ফিসফিস করে বলে-  আসলে ভয় পাইসে, এখন হইসে না এনিমি প্রপার্টি?

লুঙ্গিপরা পুরুষরা বলে, আসেন আসেন। মাথা ঢাকা মেয়েরা বলে, বসেন, নাস্তাপানি করেন।

আমি শুকনো ঠোঁটে জিব বুলোই – বাড়িটা দেখব… 

আসেন, দেখাই।

ওড়নাঢাকা মেয়ের পেছন পেছন বাড়ি ঢুকি। অচেনা ঘরদোর, রান্নাঘরে সারিসারি হাঁড়ি। মেহেমানের জন্য ডাবের জল   আসে। অসম্ভব মিষ্টি তা। মেয়েটি মৃদু স্বরে বলে, এটা বহু পুরাতন গাছ, আপনার দাদামশাইয়ের সময়ের।

দীঘির পাশে এসে দাঁড়াই। পাশে গাছেঠাসা বাগান। আমি ফ্যাসফেসে গলায় বলি, বাগানগুলো দেখে আসি…

লুঙ্গিপরা পুরুষরা সমস্বরে বলে ওঠে, বাগানগুলি? না না, হেয়া কিসু নাই।

আমি ইকবালভাইয়ের দিকে ফিরে অসহায়ের মত বলি, না ছিল, অনেকগুলো বাগান ছিল আমাদের, আর কাঠের একটা বাড়ি, চারতলার হলঘর; বিশ্বাস করুন!

লুঙ্গিপরা পুরুষ, হাতে তার ধারালো কাটারি, উড়ে এসে জুড়ে বসা মেহেমানের জন্য ডাব কাটছে সে; ধারালো কাটারির মতই তার চোখ ঝিকিয়ে ওঠে।– আমরাও মিছা কইনা, এতগুলান বৎসর চইল্যা গ্যাসে, সব কি আগের মতই থাকে? 

 যেতে হবে এবার, দিঘির জলে হাত ডোবাই। সবুজ জল কথা বলে ওঠে, এতদিনে আসার সময় হল বুঝি? বুকের  রক্ত তোলপাড় করে সহসা একটা ডাহুক ডেকে ওঠে। পঞ্চান্ন বছর ধরে জমে থাকা আমার পরিজনদের রাগ-বঞ্চনা- অভিমান আমাকে তাড়না করতে থাকে। 

ধীর পায়ে বেরিয়ে আসি… সেই স্বপ্নের রাস্তা ধরে। জীর্ণ মন্দিরে উঁকি মারি। দেবতা দাঁড়িয়ে আছেন; একা…আবছা!

 *           *             *          *          *     

একটু পরেই জাহাজ ছাড়বে। সবশেষে এসেছি দাদুভাইয়ের বইয়ের দোকান দেখতে। যা তিনি তাঁর প্রিয় ছাত্র কাদেরকে দিয়ে এসেছিলেন। প্রফেসর কাদের এখন খুব বিখ্যাত মানুষ, বিদেশে থাকেন। আর সেই দোকানও খুব বিখ্যাত এখন,  বরিশালের সবথেকে অভিজাত রেস্টুরেন্ট। যেখানে বসে আসিফ আমাকে গরুর ব্রেন কারি খাবার জন্য সাধাসাধি করছে। আর আমি ভাঙা গলায় মিনমিন করে বলার চেষ্টা করছি – জানেন তো, এই দোকানে জীবনানন্দ আসতেন, সমস্ত  বিখ্যাত লোকেরা এখানে আড্ডা বসাতেন!

আসিফের সে সবে মন নেই। সে আমাকে আপ্যায়নে ব্যস্ত।- আপনি তাইলে মাটন বিরিয়ানি খান; মনে থাকবে  বরিশালের এই বিরিয়ানি। আমরাও খাব, তার আগে ব্রেনকারি। একটু চাইখ্যা দ্যাখলে পারতেন…

সেই একই জাহাজ। সারেং দাদা হাত নাড়ে- বুইন, দেশের বাড়ি কেমন দ্যাখলা?

ইকবাল ভাই কেবিনে ব্যাগপত্র তুলে দেয়। নাভিমূল অব্দি কাঁপিয়ে দিয়ে, মহাকালের ধ্বনির মত জাহাজের ভোঁ বেজে ওঠে। ফার্স্ট ওয়ার্নিং … ইকবাল ভাই আমার দিকে তাকায়, কুণ্ঠিত হাসি নিয়ে। – আবার আইবেন, বরিশালের নদীই তো দেখা হইল না। 

আমি ঘাড় নাড়ি, আচ্ছা!

জাহাজ যথা সময় নড়ে ওঠে। এতক্ষণ আটকে রাখা চোখের জল, গাল বেয়ে গড়িয়ে আসে। দিঘির পারের সেই ডাহুকটা  যেন   বুকের ভেতর ঘাঁটি গেড়ে ডেকেই চলেছে। জোলো হাওয়া মাথায় আদরের হাত বোলায়। আর তখনই তীব্র হয়ে ভেসে ওঠে মায়ের বিষণ্ণ মুখ, বৈভবের গায়ের গন্ধ; কলকাতা…আমার ঘরবাড়ি-কাজ-বন্ধুবান্ধব! ওরা আমাকে  হাতছানি দিয়ে ডাকে। 

আমার যেন নিঃশ্বাসে টান পড়ে; কলকাতার বাতাসে যে আমার নিঃশ্বাস বাঁধা পড়ে আছে…          

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here