বৃহস্পতিবার, অক্টোবর ৬, ২০২২

Close

Home বিশেষ খবর বাফেলো: যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে আরেক বাংলাদেশ

বাফেলো: যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে আরেক বাংলাদেশ

বিদেশে বাংলাদেশ

যোবায়ের আহমদ :

আমেরিকার একটি শহরে গিয়ে আপনি দেখলেন শহরটির সব চলছে বাংলায়। রাস্তাঘাটে টাঙানো বিজ্ঞপ্তি, ব্যানার হতে সবকিছু ইংরেজির পাশাপাশি বাংলায় লেখা, আশেপাশে সব বাঙালি মানুষ, মসজিদ ভর্তি বাঙালি মানুষ, পাওয়া যাচ্ছে বাঙালি খাবার। সবাই কথা বলছে বাংলা ভাষায়। একেকজন প্রাণবন্ত আন্তরিক মানুষজনে চারপাশ ঘেরা। তখন আপনার অনুভূতি কেমন হবে? এ যেন যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে আরেকটি বাংলাদেশ। হ্যাঁ এটিই হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের বাফেলো শহর। আরেকটি বাংলা টাউন।

নিউইয়র্কের থেকে ৩৭৫ মাইল দূরে কানাডার কূলঘেষে বাফেলোর অবস্থান। পশ্চিমে ইরিক্যানেল, উত্তরে নায়াগ্রা জলপ্রপাত, দক্ষিণে বাফেলো নদী দ্বারা বেষ্টিত আমেরিকার সবচেয়ে পরিকল্পিত শহর বাফেলো। আমেরিকার প্ল্যানিং অ্যাসোসিয়েশনের হিসাবমতে আমেরিকার সেরা দশ শহরের তালিকায় বাফেলোর অবস্থান সবার শীর্ষে। বাফেলোর আয়তন ৫২ বর্গমাইল। ট্রাফিক জ্যামহীন বাফেলো সিটির এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে যেতে মাত্র ১৫ মিনিটের মতো সময় ব্যয় হয়। এককালে নিউইয়র্কের রাজধানী এবং আমেরিকার অষ্টম বৃহত্তম বাফেলো শহর কীভাবে পরিত্যক্ত হয়ে পড়ে এবং মাত্র এক দশকে বাঙালি অধ্যুষিত একটি মুসলিম শহর, মসজিদের শহরে পরিণত হয়েছে তা জানবো এই প্রতিবেদনে।

বাফেলোতে ঈদ পুণর্মিলনী, দেখে মনে হয় আরেক বাংলাদেশ

একটি ছোট গ্রাম হিসেবে বাফেলোর গোড়াপত্তন হয় ১৭৮৯ সালে। আমেরিকার রাজধানী ওয়াশিংটন ডি সির বিখ্যাত নকশাবিদ আন্দ্রে এলিকটের ভাই নগর পরিকল্পনাবিদ জোসেফ এলিকট এই শহরটির নকশা করেন। ১৮২৫ সালের দিকে ইরি ক্যানেল নামে নদীপথ চালু হওয়ার পর এ শহর জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। ১৯০০ সালের মধ্যে বাফেলো আমেরিকার অষ্টম বৃহৎ শহরে পরিণত হয়। তবে আটলান্টিক মহাসাগরে যাওয়ার নতুন একটি সমুদ্রপথ চালুর পর থেকে বাফেলো বাণিজ্যিকভাবে গুরুত্বহীন হয়ে পড়ে। ১৯৯০ সালের দিকে মানুষ কর্মসংস্থানের অভাবে বাফেলো ছাড়তে শুরু করে। শোনা যায়, রাজধানী স্থানান্তরের পর প্রায় ৩৫ হাজার কর্মকর্তা কর্মচারী বাফেলো শহর ছেড়ে যান। ফলে শহরে এক প্রকাশ শূন্যতা তৈরি হয়। বাফেলো পরিণত হয় সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্যে।

এই সময় অনেক পরিত্যক্ত বাড়ি কম দামে বিক্রি শুরু হয়। বলা হয় নিউইয়র্কের কয়েক মাসের বাড়ি ভাড়া দিয়ে বাফেলো শহরে একটি বাড়ি কিনে ফেলা যেত। কম খরচে সেরা আবাসনের কারণে অনেকের কাছে বাফেলো জাদুর শহর হিসেবে পরিচিতি পায়। বিশেষত বাঙালি অভিবাসীরা যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন স্টেট থেকে বাফেলো শহরে আসতে শুরু করে।

বাঙালিরা স্থানান্তরের পর থেকে বদলে গেছে বাফেলো শহরের কর্মসংস্থান, আবাসন ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা। গড়ে উঠেছে হালাল মার্কেট, গ্রোসারি শপ, হালাল রেস্তোরা, অনেক মসজিদ। অপরাধ প্রবণতা ৭০ শতাংশ থেকে নেমে ৩০ শতাংশে এসেছে। ফলে বাফেলোর প্রতি আকর্ষণ বাড়ছে মানুষের। বাড়ি ভাড়া ও দামের কারণেই যে যেখানে বাড়ি ভাড়া ও বাড়ির দাম কম পেয়েছেন, সে সেখানেই ঘাঁটি বেঁধেছেন অভিবাসীরা। তবে ফিলমোর অ্যাভিনিউসহ তার আশপাশের এলাকায় উল্লেখযোগ্যসংখ্যক বাঙালির বসবাস রয়েছে। বর্তমানে প্রায় দেড় হাজারের বেশি বাংলাদেশি পরিবার বাফেলো শহরে বাস করছে। ক্রমবর্ধমান বাংলাদেশি কমিউনিটির মুখপাত্র হিসেবে ‘বাফেলো বাংলা’ নামে একটি মাসিক পত্রিকাও প্রকাশিত হচ্ছে। এই পত্রিকাটি বাঙালি পাঠকদেরকে সম্পূর্ণ ফ্রি-তে দেওয়া হয়।

একসময় খ্রিষ্টান অধ্যুষিত বাফেলো শহরে খ্রিষ্ট্রীয় উপসনালয়, গির্জা দ্বারা পরিপূর্ণ ছিল। কিন্তু বর্তমানে খ্রিষ্ট্র ধর্মীয় অনুসারীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে কমে যাওয়ায় বাধ্য হয়ে গির্জা কর্তৃপক্ষ গির্জাগুলো মুসলিমদের কাছে বিক্রি করে দিচ্ছেন। বাঙালি মুসলমানরা গির্জাগুলো কিনে মসজিদ, মাদ্রাসা ও ইসলামী সেন্টার হিসেবে গড়ে তুলছেন। বর্তমানে শহরটিতে প্রায় ১৭ টি মসজিদ রয়েছে। বড় বড় স্থাপনা ও ভবন নামমাত্র দামে কিনে গড়ে তোলা হয়েছে এসব মসজিদ ও মাদ্রাসা। নিউইয়র্ক অঙ্গরাজ্যের সবচেয়ে বড় মাদ্রাসা এখন বাফেলোতে অবস্থিত। এমনকি বাফেলোর পুরনো জেলখানাটি এখন যুক্তরাষ্ট্রের সর্ববৃহৎ আবাসিক/অনাবাসিক নারী মাদরাসায় পরিণত হয়েছে। যেখানে ইসলামি শিক্ষা কার্যক্রমের পাশাপাশি দেশটির শিক্ষা কার্যক্রমের অন্তর্ভুক্ত সিলেবাসও পড়ানো হয়।

পল্লী সুপার মার্কেট, বাফেলো

বাফেলো শহরে বেশিরভাগ মুসলিম নারী ও মেয়েরা হিজাব মাথায় চলাফেরা করেন। হিজাবের আধিক্যের কারণে এ শহরকে হিজাবের নগরীও বলা হয়। অনেকে বলেন, শহরের ইসলামি পরিবেশ, আইন-কানুনের যথাযথ ব্যবহারের ফলে সন্ত্রাসসহ নানাবিধা ভয়ভীতি থেকে মুক্ত এ শহর।

বাফেলোর মারকাজ মসজিদ মুসলিমদের তাবলিগ জামাতের প্রধান কার্যালয় হিসেবে পরিচিত। মসজিদের ইমাম, মুয়াজ্জিনসহ ৯০% ভাগ মুসল্লি বাংলাভাষী। এ মসজিদকে ঘিরে বিয়ে-ওয়ালিমা ও আকিকাসহ ধর্মীয় যেকোনো আচার-অনুষ্ঠান সম্পন্ন হয়। এর সব ব্যবস্থা রয়েছে। বাফেলোর উল্লেখযোগ্য মসজিদগুলো হলো- বার্মিজ মসজিদ, বায়তুল মোকাররম, মারকাজ মসজিদ, মসজিদে তাকওয়া, জাকারিয়া মসজিদ, লাককুয়ানা (ইয়েমেনি), কানেক্টিকাট ও মিনার মসজিদ।

আমেরিকায় যেসব বাংলাদেশিরা কাজের জন্য আসেন, তাদের বেশিরভাগেরই গন্তব্য হয় নিউইয়র্কে। আমেরিকার সবচেয়ে জনবহুল শহর নিউইয়র্কে প্রায় আড়াই লাখেরও বেশি অভিবাসী বাংলাদেশি বসবাস করে। বিশ্বের অন্যতম প্রধান অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র নিউইয়র্কে বসবাস করা এতোটাই বেশি ব্যয়বহুল যে স্বল্প আয়ের মানুষ তো বটেই, এমনকি মধ্যম আয়ের মানুষরাও হিমশিম খেতে হয়। নিউইয়র্কে বসবাসকারী বাংলাদেশী অভিবাসীদের প্রতি তিনজনে একজন আবার দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করে। তাই বাঙ্গালিদের কাছে বাফেলো স্বপ্নের শহর। সুন্দর, ছিমছাম পরিবেশে নিজের একটি বাড়ি এটিই যেন বড় পাওয়া।

#প্রবাস #বাংলাদেশ #বাফেলো #প্রবাসী #ইউএসএ #আমেরিকা

আপনার মন্তব্য দিন

আপনার মন্তব্য লিখুন!
এখানে আপনার নাম লিখুন

- Advertisment -
  • সর্বশেষ
  • আলোচিত

সাম্প্রতিক মন্তব্য

স্বঘোষিত মহাপুরুষ on লকডাউন বাড়লো আরও একসপ্তাহ
জান্নাতুল ফেরদৌস on চিরবিদায় কিংবদন্তি কবরীর