শনিবার, সেপ্টেম্বর ১৮, ২০২১

Close

Home বিশেষ খবর রাজনীতির মহানায়কের জন্মদিন

রাজনীতির মহানায়কের জন্মদিন

লাখো জনতার সমুদ্রে তিনি বজ্রকণ্ঠে উচ্চারণ করেছিলেন স্বাধীনতার অমর কবিতা— ‘আমরা যখন মরতে শিখেছি, তখন কেউ আমাদের দাবায়ে রাখতে পারবা না।’ শোষকের বিরুদ্ধে লড়াই করে মানুষকে সাম্যের মুক্তি এনে দেওয়ার প্রত্যয় ধ্বনিত হয়েছিল তার কণ্ঠে— ‘রক্ত যখন দিয়েছি, আরও রক্ত দেবো। এই দেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়ব ইনশাআল্লাহ।’ জনগণের মুক্তির নেশায় বিভোর সেই মানুষটির আজীবন সংগ্রাম-লড়াইয়ের মূল চালিকাশক্তিই ছিল মানুষের ভালোবাসা। সে কারণেই তিনিই বলেছেন, ‘সাত কোটি বাঙ্গালির ভালোবাসার কাঙাল আমি। আমি সব হারাতে পারি, কিন্তু বাংলাদেশের মানুষের ভালোবাসা হারাতে পারব না।’

রাজনীতির মহানায়ক, বাঙালিকে স্বাধীনতার সুবর্ণ ‍মুহূর্ত এনে দেওয়া সেই মহান মানব জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ১০১তম জন্মশতবার্ষিকী আজ বুধবার (১৭ মার্চ)। হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ এই বাঙালির প্রতি তাই শ্রদ্ধাবনত জাতি।

১৯২০ সালের এই দিনে গোপালগঞ্জ জেলার টুঙ্গিপাড়ায় জন্ম বাঙালি জাতির অবিসংবাদিত এই নেতার। গত বছর, অর্থাৎ ২০২০ সালের ১৭ মার্চ তার জন্মের শত বছর পূর্ণ হয়। সেই মাহেন্দ্রক্ষণ সামনে রেখে জাতির জনকের জন্মশতবর্ষ উদযাপনে ২০১৮ সালের জুলাইয়ে সরকার ২০২০ সালের ১৭ মার্চ থেকে ২০২১ সালের ২৬ মার্চ পর্যন্ত সময়কে ‘মুজিববর্ষ’ ঘোষণা করে। বছরব্যাপী নানা আয়োজনে এই ‘মুজিববর্ষ’ উদযাপনের পরিকল্পনাও হয়।

এর মধ্যে, ২০২০ সালের ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের দিনটিতে মুজিববর্ষের লোগো উন্মোচন করা হয়। শুরু হয় মুজিববর্ষের ক্ষণগণনা, তখন কেবল অপেক্ষা ১৭ মার্চের। সেদিন বিভিন্ন দেশের সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধানের উপস্থিতিতে জাতীয় প্যারেড গ্রাউন্ডে বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠান হওয়ার কথা ছিল।

তবে এর আগেই বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে করোনাভাইরাস, ৮ মার্চ দেশেও এই ভাইরাসের উপস্থিতি শনাক্ত হয়। শেষ পর্যন্ত বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকীর সেই উদ্বোধনী অনুষ্ঠান ১৭ মার্চ রাত ৮টায় দেশের সব টেলিভিশন চ্যানেল, অনলাইন ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একযোগে প্রচার করা হয়। এরপর মুজিববর্ষ ঘিরে সব আয়োজনই ভার্চুয়াল প্ল্যাটফর্মে উদযাপনের সিদ্ধান্ত হয়। পরে সব অনুষ্ঠান ঠিকমতো আয়োজন করতে না পারায় মুজিববর্ষের মেয়াদ এ বছরের ২৬ মার্চ থেকে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে।

এবারে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ কিছুটা হলেও স্তিমিত থাকায় এবং দেশে করোনাভাইরাসের ভ্যাকসিন প্রয়োগ কার্যক্রম গতিশীল থাকায় ফের মুজিববর্ষ তথা জাতির জনকের জন্মশতবার্ষিকীর আয়োজন করছে সরকার। বর্ণাঢ্য আয়োজনে ১৭ মার্চ থেকে শুরু করে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্থীর মাহেন্দ্রক্ষণ ২৬ মার্চ পর্যন্ত ১০ দিনব্যাপী চলবে এই আয়োজন।

বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর বছরে বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকীর এই আয়োজনের দায়িত্বে রয়েছে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উদযাপন জাতীয় বাস্তবায়ন কমিটি। ‘মুজিব চিরন্তন’ প্রতিপাদ্যে এই আয়োজনে আজ বুধবারের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের থিম ‘ভেঙেছ দুয়ার, এসেছ জ্যোতির্ময়’। জাতীয় প্যারেড স্কয়ারে এই আয়োজনের উদ্বোধন করবেন বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনিই অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করবেন। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি থাকবেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ। সম্মানিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন মালদ্বীপের রাষ্ট্রপতি ইব্রাহিম মোহামেদ সলিহ্।

জাতির পিতার জন্মশতবার্ষিকী উদযাপন জাতীয় বাস্তবায়ন কমিটি জানিয়েছে, ‘মুজিব চিরন্তন’ প্রতিপাদ্যে প্রতিদিন পৃথক থিমভিত্তিক আলোচনা অনুষ্ঠান, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, অডিও-ভিজ্যুয়াল এবং অন্যান্য বিশেষ পরিবেশনার মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুর প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করা হবে। করোনা পরিস্থিতিতে স্বাস্থ্যবিধি মেনে এসব অনুষ্ঠানে থাকবে সীমিত দর্শকের উপস্থিতি। ১০ দিনের অনুষ্ঠানে পাঁচ দিন উপস্থিত থাকবেন পাঁচটি দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান। তবে ওই পাঁচ দিনের আয়োজনে সর্বোচ্চ ৫শ জন আমন্ত্রিত অতিথি অংশ নিতে পারবেন। অনুষ্ঠানে আসার আগে পরীক্ষা করে নিশ্চিত হতে হবে যে তিনি সংক্রমিত নন। বাকি পাঁচ দিনের আয়োজনে অতিথিদের কেউ প্যারেড গ্রাউন্ডে থাকবেন না। শিল্পীদের পরিবেশনা সেখানে থেকে সম্প্রচার করা হবে।

টুঙ্গিপাড়ার ‘খোকা থেকে ‘জাতির জনক

১৯২০ সালে টুঙ্গীপাড়ায় শেখ মুজিবুর রহমান জন্ম নেন শেখ লুৎফর রহমান ও সায়েরা খাতুন দম্পতির ঘর আলো করে। মা-বাবা আদর করে ডাকতেন ‘খোকা’। সেই ‘খোকা’ই কালক্রমে হয়ে ওঠেন নির্যাতিত-নিপীড়িত বাঙালি জাতির মুক্তির দিশারী। রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, আত্মত্যাগ ও জনগণের প্রতি অসাধারণ মমত্ববোধের কারণেই পরিণত বয়সে হয়ে ওঠেন বাঙালি জাতির অবিসংবাদিত নেতা।

কিশোর বয়সেই শেখ মুজিব যুক্ত হয়ে পড়েন সক্রিয় রাজনীতিতে। গোপালগঞ্জের মিশন স্কুলে অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার সময় ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে যোগ দিয়ে প্রথমবারের মতো কারাবরণ করেন। এরপর থেকে শুরু হয় আজীবন সংগ্রামী জীবনের অভিযাত্রা। বাংলা, বাঙালি ও বাংলাদেশকে ভালোবেসে ভূষিত হন ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে। হয়ে ওঠেন মুক্তির মহানায়ক। বাঙালিকে এনে দেন স্বপ্নের স্বাধীনতা।

মহান মুক্তিযুদ্ধে বিজয় অর্জনেই শেষ নয়, যুদ্ধবিধ্বস্ত স্বাধীন বাংলাদেশকে আত্মবিশ্বাসী ও আত্মনির্ভরশীল একটি জাতি হিসেবে গড়ে তুলতে অব্যাহত ছিল জাতির জনকের সংগ্রাম। কিন্তু স্বাধীনতার মাত্র সাড়ে তিন বছরের মাথায় স্বাধীনতাবিরোধী অপশক্তির ষড়যন্ত্রের জাল ছড়িয়ে পড়ে। পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট ঘাতকের বুলেট ছিন্ন ভিন্ন করে দেয় পিতার শরীর। সেই কালরাত কেড়ে নেয় স্ত্রী-সন্তানসহ বঙ্গবন্ধুর পরিবারের সব সদস্যের জীবন। কেবল দেশের বাইরে অবস্থান করার কারণে বেঁচে যান বঙ্গবন্ধুর দুই কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার ছোট বোন শেখ রেহানা।

জাতীয় শিশু দিবস

রাজনীতির মহান কবি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন কোমল হৃদয়ের অধিকারী। শিশু-কিশোরদের প্রতি তার বাৎসল্য ছিল অপরিসীম। ধানমন্ডির-৩২ নম্বর বাসভবনে শিশুদের ছিল অবাধ বিচরণ। বঙ্গবন্ধু বিশ্বাস করতেন, আজকের শিশুরাই আগামী দিনের ভবিষ্যৎ। আগামীতে দেশ গড়ার নেতৃত্ব তারাই দেবে। বঙ্গবন্ধু কোনো শিশুদের সমাবেশে গেলে বা শিশুরা বঙ্গভবনে তার সংস্পর্শে আসলে তিনি তাদের সঙ্গে মিলে-মিশে একাকার হয়ে যেতেন।

এ কারণেই তার জন্মদিনটিকে ১৯৯৭ সালে ঘোষণা করা হয় জাতীয় শিশু দিবস হিসেবে। ২০০১ সালে চার দলীয় জোট ক্ষমতায় এলে রাষ্ট্রীয়ভাবে দিবসটি পালন করা হয়নি। পরে আওয়ামী লীগ ফের সরকার গঠনের পর থেকে দিনটি রাষ্ট্রীয়ভাবে পালিত হয়ে আসছে। আজ সেই শিশু দিবসও দেশব্যাপী যথাযোগ্য আয়োজনে পালন করা হবে।

দিনব্যাপী কর্মসূচি

দিবসটি উপলক্ষে সরকারি ও দলীয়ভাবে বিভিন্ন কর্মসূচি উদযাপন করা হবে। বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবারের সদস্যদের রুহের মাগফেরাত কামনা করে সারাদেশে বিভিন্ন মসজিদে মিলাদ ও দোয়া মাহফিল এবং অন্যান্য উপাসনালয়ে প্রার্থনা সভা অনুষ্ঠিত হবে। বাংলাদেশ বেতার, বাংলাদেশ টেলিভিশন ও বিভিন্ন বেসরকারি টিভি চ্যানেল দিবসটির তাৎপর্য তুলে ধরে বিশেষ অনুষ্ঠানমালা প্রচার করবে। জাতীয় দৈনিকগুলো বিশেষ ক্রোড়পত্র প্রকাশ করবে।

এদিকে, ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ দলীয়ভাবে দিবসটি উপলক্ষে বিভিন্ন কর্মসূচি নিয়েছে। বুধবার সকাল সাড়ে ৬টায় বঙ্গবন্ধু ভবন ও দেশব্যাপী দলীয় কার্যালয়ে জাতীয় ও দলীয় পতাকা উত্তোলন করা হবে। সকাল ১১টায় বঙ্গবন্ধু ভবন প্রাঙ্গণে রক্ষিত জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতিতে জানানো হবে শ্রদ্ধা।

আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের একটি প্রতিনিধি দল টুঙ্গীপাড়ায় চিরনিদ্রায় শায়িত জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সমাধিতে শ্রদ্ধা জানাবে। সেখানে প্রতিনিধি দলের সদস্যরা বাদ জোহর দোয়া ও মিলাদ মাহফিলে অংশ নেবেন।

আপনার মন্তব্য দিন

আপনার মন্তব্য লিখুন!
এখানে আপনার নাম লিখুন

- Advertisment -
  • সর্বশেষ
  • আলোচিত

সাম্প্রতিক মন্তব্য

স্বঘোষিত মহাপুরুষ on লকডাউন বাড়লো আরও একসপ্তাহ
জান্নাতুল ফেরদৌস on চিরবিদায় কিংবদন্তি কবরীর