বৃহস্পতিবার, অক্টোবর ৬, ২০২২

Close

Home বিশেষ খবর সাঁতার জেনেও পানিতে ডুবে মানুষ মারা যায় কেন?

সাঁতার জেনেও পানিতে ডুবে মানুষ মারা যায় কেন?

যোবায়ের আহমদ : গত কয়েকদিন আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হলের পুকুরে ডুবে ৩য় বর্ষের ছাত্র আরিফুর রহমান পলাশ মারা যান। একই দিনে সাতক্ষীরার কলারোয়া থানার পুকুরে গোসল করতে নেমে সাঁতার কাটার সময় হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে এক পুলিশ সদস্যের মৃত্যু ঘটে।

বিজ্ঞান মতে, মানুষ সহ প্রায় সকল স্থলচর প্রাণি পানিতে ডুবে গেলে স্বল্প সময়ের ভিতরেই মৃত্যুবরণ করে। কিন্তু পানিতে বসবাসকারী জীব অর্থাৎ জলজ প্রাণি সমূহ বিশেষত মাছ পানিতে সার্বক্ষণিক বেঁচে থাকে।

এর পিছনে বিজ্ঞানীরা দু’টি কারণ চিহ্নিত করেছেন। প্রথমটি হলো শ্বসন আর দ্বিতীয়টি পানির চাপ ।

মাছ ফুলকার সাহায্যে শ্বাস নেয়। মাছ পানিতে চলার সময়ে মুখ হা করে থাকে যা দিয়ে পানি প্রবেশ করে এবং ফুলকার ছিদ্র (কানকো) দিয়ে বেরিয়ে যায়।  এ সময় পানি যখন ফুলকার কাছে থাকে তখন পানিতে থাকা অক্সিজেন ফুলকার সংস্পর্শে আসে। তখন ফুলকায় থাকা বায়ু সংগ্রাহক মেকানিজম অক্সিজেন সংগ্রহ করে সেটি দিয়ে মাছের শ্বসন প্রক্রিয়া চলমান থাকে।

এমনিভাবে কোন মানুষ পানিতে ডুবে গেলে তার নাক মুখ দিয়ে পানি ঢুকে ফুসফুসে চলে যায়। কিন্তু আমাদের ফুসফুস পানি থেকে অক্সিজেন আলাদা করতে সক্ষম নয় ফলে শ্বাস-প্রশ্বাস প্রক্রিয়া বন্ধ হয়ে মানুষ মৃত্যুবরণ করে।

বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব অনুসারে, সেসব পদার্থের ভর আছে তারা অভিকর্ষ বলের প্রভাবে চাপ প্রয়োগ করে থাকে।  পানি বাতাসের তুলনায় প্রায় ৬০০ গুন বেশি ঘন।  পানির প্রতি ৩৩ ফুট গভীরতায় পানির চাপ এক এটম বায়ুর চাপের আকারে বাড়ে । তার মানে আমাদের মাথার উপরে থাকা এই ৪০০ কিঃমিঃ বায়ু মন্ডল একক ক্ষেত্রফলের(এক বর্গ মিটার) উপরে যে চাপ প্রয়োগ করে সেই চাপ ৩৩ ফুট বা ১০.০৫৮৪ মিটার পানির নিচের সমান চাপ সৃষ্টি করে। ৬৬ ফুট নিচে পানির চাপ বায়ুমন্ডলের চাপের দ্বিগুণ হয়ে যাবে। এভাবে প্রতি ৩৩ ফুট অন্তর এই চাপ ১ এটম হারে বাড়তেই থাকবে ।

আর চাপ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বস্তু সংকুচিত হতে থাকে। এই কারণে পানিতে ডুবে মরা মানুষেরও চোখ বড় হয়ে যায়, দেহ ফুলে যায় এবং জিহবা বের হয়ে আসে। যদিও এর সাথে ব্যাকটেরিয়ার ভূমিকাও আছে।

তবে একজন সুস্থ সবল সাঁতার জানেন এমন মানুষ অনেক সময় পুকুরে ডুবে মারা যান। এর পিছনে অনেকে ভৌতিক অভিজ্ঞতার কথা বলেন। আসলেই কি অশরীরী কিছু আছে নিচে টেনে নিয়ে যায় নাকি এর পিছনে বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা আছে। বিস্তারিত জানব।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মৃত্তিকা, পানি ও পরিবেশ বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. হারুনর রশীদ খান বলেন, সাঁতার কাটতে কাঁটতে আমাদের শরীরের এনার্জি লস হয়ে যায়। এর ফলে শরীর ক্লান্ত হয়ে পড়ে। এ সময় আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে অনেকে ডুবে যেতে পারেন। দুর্বল চিত্তের মানুষ অথবা হার্টের রোগী অতিরিক্ত প্রেশারে হৃদক্রিয়া বন্ধ হয়ে যেতে পারে। ফলে ফুসফুসে পানি ঢুকে তিনি মারা যান।

হৃদক্রিয়া বন্ধ হয়ে মারা যেতে পারেন অনেকে। ছবি : আনস্প্লাশ।

অনেকক্ষণ সাঁতার দেওয়ার পর ব্যক্তি নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলতে পারেন আবার তীর থেকে অনেক দূরে থাকলে মানসিকভাবেও নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলতে পারেন। এটা বেশির ভাগ ঘটে ব্যক্তি নিজের সক্ষমতার বেশি যখন সাঁতার কাটেন। সাঁতার কাটার সময় শরীরের উপর অনেক চাপ পড়ে। এতে অনেক শক্তি-সক্ষমতার প্রয়োজন রয়েছে। ব্যক্তির এ  সক্ষমতা না থাকার ফলে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেন কয়েক মুহূর্তের জন্য। আর মৃত্যুর জন্য এইটুকুই যথেষ্ট।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জীববিজ্ঞান অনুষদভূক্ত প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. আমিনুল ইসলাম ভূঁইয়া কয়েকটি কারণ চিহ্নিত করেছেন। সেগুলো হলো :

হাত-পায়ের পেশিতে টান লাগা (Muscle Cramps):

পুকুরে সাঁতার কাটতে নেমে অনেকের হাত-পায়ের পেশিতে টান লাগে। এটি একটি কমন সমস্যা। এমতাবস্থায় ডুবে যাওয়ার সময় হাত পা ঝাপটে সাহায্য চাওয়াও সম্ভব হয় না। খুব বেশি পরিশ্রম করে সঙ্গে সঙ্গে পুকুরে নেমে গেলে, ডিহাইড্রেটেড অবস্থায় পানিতে নামলে এটি ঘটতে পারে। এছাড়াও, কারো দেহে ক্যালসিয়াম, ফসফরাস, পটাশিয়াম, আয়রন, জিংক তথা ইলেকট্রোলাইট কম থাকলে তাদের হাত-পায়ের পেশিতে ঘন ঘন টান পড়তে দেখা যায়।

grayscale photo of woman drowning in water
পেশিতে টান লেগে অনেকে মৃত্যুবরণ করেন। ছবি : আনস্প্লাশ।

মাইল্ডস্ট্রোক (Transient Ischemic Attack, TIA):

ব্যক্তি পুকুরে কিংবা বাথটাবের পানিতে নামলে মাইল্ডস্ট্রোক দেখা দিতে পারে। তবে এক্ষেত্রে ভিকটিমের দেহ নিথর হয়ে গেলেও কয়েক মিনিটের মধ্যেই আবার ঠিক হয়ে যায়। কিন্তু এই ‘কয়েক মিনিট’ পুকুরে ডুবে যাওয়ার জন্য যথেষ্ট।

হার্ট অ্যাটাক (Cardiac Arrest):

পুকুর, দীঘি বা সুইমিংপুলে নেমে যে কারোরই কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট হতে পারে। তবে স্থুলকায় ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে যেহেতু হার্ট কন্ডিশন সুস্থ মানুষের তুলনায় দুর্বল, সেক্ষেত্রে তাদের ঝুঁকিটা একটু বেশি। হার্ট অ্যাটাক ঘটার সঙ্গে সঙ্গে ডাঙায় তুললে ভিকটিমের বেঁচে যাওয়ার সম্ভাবনা ব্যাপক। যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি বছর ১৫-২০ জন মানুষ এভাবে মারা যায়।

woman underwater
পানিতে অক্সিজেন স্বল্পতার কারণে অনেকে মারা যেতে পারে। ছবি : আনস্প্লাশ।

পানিতে অক্সিজেন স্বল্পতা (Lack of oxygen in the water):

পুকুর ও দীঘি হচ্ছে বদ্ধ জলাশয়। বদ্ধ জলাশয়ে সারা বছরই অক্সিজেন লেভেল কম-বেশি হতে থাকে। মেঘলা আবহাওয়া, পুকুরে শ্যাওলা বা উদ্ভিদের আকস্মিক মৃত্যু, বর্জ্যের কারণে পানিতে অন্যান্য গ্যাস মিশ্রিত থাকা এসব কারণে পুকুরে অক্সিজেন ক্ষয় ঘটতে পারে। পুকুরে অক্সিজেন লেভেল কম থাকলে সে পুকুরে ভেসে থাকা যায় না, তথা সাঁতার কাটা কঠিন। পুকুরের সব প্রান্তেই অক্সিজেন মাত্রা সমান থাকে তা-ও নয়। একেক অংশে অক্সিজেন মাত্রা একেক রকম হতে পারে।

পুকুরে ডুবে মৃত্যু নিয়ে নানা ভৌতিক গল্প ছড়িয়ে পড়লেও পরীক্ষা করে দেখা যায় পুকুরে অক্সিজেন মাত্রা কম ছিল। অনেক সময় ব্যক্তির মনে ভয় ঢুকে যায় তার ফলে এটি ঘটতে পারে।

তবে উপরোক্ত দু’জন অধ্যাপকই এটিকে ব্যক্তির বিশ্বাসের সঙ্গে তুলনা করেছেন। ব্যক্তির যদি ভূতে বিশ্বাস থাকে তাইলে তার ভৌতিক মনে হতে পারে। আবার বিশ্বাস না থাকলে এটি ঘটবে না।

তবে যাইহোক অজানা-অচেনা জায়গায় হুটহাট যে কোনো পুকুর বা দীঘিতে নেমে যাওয়া থেকে বিরত থাকা ভালো।

আপনার মন্তব্য দিন

আপনার মন্তব্য লিখুন!
এখানে আপনার নাম লিখুন

- Advertisment -
  • সর্বশেষ
  • আলোচিত

সাম্প্রতিক মন্তব্য

স্বঘোষিত মহাপুরুষ on লকডাউন বাড়লো আরও একসপ্তাহ
জান্নাতুল ফেরদৌস on চিরবিদায় কিংবদন্তি কবরীর